প্রাচীন জাপান ও সামুরাইদের উৎপত্তি
খ্রিস্টপূর্ব ৬৬০ অব্দে জাপানের সূর্যদেবী আমাতেরাসু ওমিকামি তার পুত্র মিকোতোকে তিনটি পবিত্র বস্তু প্রদান করেন: একটি স্বচ্ছ আয়না (ইয়াতা নো কাগামি), একটি চোখধাঁধানো রত্নপাথর (ইয়াসাকানি নো মাগাতামা) এবং একটি চকচকে তলোয়ার (কুসানাগি নো সুরুগি)। এই তিনটি পবিত্র বস্তু জাপানের রাজপরিবারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ‘চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসন’ বা ক্রিসেনথিমাম থ্রোনের অধিকার নির্ধারণ করে। জাপানি বিশ্বাস অনুযায়ী, যার হাতে এই বস্তুগুলো থাকবে, তিনিই হবেন জাপানের সম্রাট। মিকোতো এই বস্তুগুলো তার উত্তরসূরি জিম্মুকে হস্তান্তর করেন, যিনি প্রথা অনুযায়ী জাপানের প্রথম সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এভাবে জিম্মু জাপানের রাজপরিবারের শাসনের সূচনা করেন, যা বিশ্বের প্রাচীনতম বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত।

৭৯৪ সালে হেইয়ান যুগের শুরুতে জাপান তখনও শিল্পবিপ্লবের স্পর্শ পায়নি। দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। সামন্ততান্ত্রিক এই সমাজে বিত্তশালী অভিজাত সম্প্রদায়ের হাতে ছিল অধিকাংশ কৃষিজমির মালিকানা। এই অভিজাতরা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের জমি ও সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ত বিশ্বস্ত কর্মচারী শ্রেণির উপর। এছাড়া, দস্যু ও লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে ফসল ও সম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত ছিল সশস্ত্র সৈন্য, যারা পরবর্তীতে ‘সামুরাই’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ‘সামুরাই’ শব্দটির অর্থ ‘সেবক’ বা ‘সেবা প্রদানকারী’, যা তাদের মূল দায়িত্ব—মনিবের সম্পদ রক্ষা—কে প্রতিফলিত করে।
Table of Contents
সামুরাইদের সূচনা ও বিবর্তন
সামুরাইদের পূর্বপুরুষরা বংশপরম্পরায় এই রক্ষকের ভূমিকা পালন করে আসছিল। এই পেশার মাধ্যমে জাপানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে ছিল সামুরাই ঐতিহ্য। কৃষিজমি ও সম্পদ রক্ষার জন্য তারা ধীরে ধীরে দক্ষ ও অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধায় পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে তারা শুধু অভিজাতদের সম্পদ রক্ষাই করেনি, বরং সম্রাটের পক্ষে বিভিন্ন শত্রুগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এর বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের বেতন, জমি এবং ব্যারাকে বসবাসের সুযোগ পেত।
১২শ শতাব্দীর শুরুতে সামুরাইরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, তারা স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। তারা কেবল যোদ্ধাই ছিল না, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকর্তা হিসেবেও ক্ষমতা অর্জন করে। এই সময়ে সামন্ততান্ত্রিক জাপানে সম্রাট মিকাডোর ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থানান্তরিত হয় শক্তিশালী গোষ্ঠীপ্রধান ও তাদের সামুরাই যোদ্ধাদের হাতে। এই ক্ষমতার পটপরিবর্তন জেম্পেই যুদ্ধের (১১৮০-৮৫) সূচনা করে, যেখানে টায়রা ও মিনামোটো গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য সংঘাতে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে মিনামোটো গোষ্ঠী, সামুরাই যোদ্ধা মিনামোটো ইয়োশিৎসুনের নেতৃত্বে, বিজয় অর্জন করে।
মিনামোটো শগুনাতের উত্থান
১১৮৫ সালে মিনামোটো ইয়োরিতোমো জাপানের কামাকুরায় প্রথম সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন, যা ‘মিনামোটো শগুনাত’ নামে পরিচিতি পায়। তিনি কামাকুরাকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন এবং সম্রাটকে কেবল প্রতীকী ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ রেখে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা সামুরাইদের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন। এই শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং আনুগত্যের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মিনামোটো শগুনাতের অধীনে কেউই শগুনের অনুমতি ছাড়া নিজেকে সামুরাই ঘোষণা করতে পারত না। এই সময়ে সামুরাইরা শুধু যোদ্ধা নয়, বরং প্রশাসক ও শাসনকর্তা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১২৭৪-৮১ সালে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের আক্রমণ জাপানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। চীনের ইওয়ান সাম্রাজ্যের মোঙ্গল বাহিনী, অস্ত্র ও সৈন্য সংখ্যায় সামুরাইদের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও, প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের পরাজয়ের কারণ হয়। ১২৭৪ সালে মোঙ্গল নৌবহর হাকাতা উপসাগরে আঘাত হানে, কিন্তু এক ভয়াবহ ঝড়, যা ‘কামিকাজে’ বা ‘ঐশ্বরিক বায়ু’ নামে পরিচিত, তাদের নৌবহর ধ্বংস করে দেয়। ১২৮১ সালে পুনরায় আক্রমণের সময়ও একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোঙ্গলরা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনাগুলো সামুরাইদের কাছে ঐশ্বরিক সুরক্ষার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে মোঙ্গল আক্রমণ মিনামোটো শগুনাতের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
আশিকাগা শগুনাত ও অস্থিরতা
মিনামোটো শগুনাতের দুর্বলতার সুযোগে সামুরাই যোদ্ধা আশিকাগা তাকাউজি বিদ্রোহ শুরু করেন এবং ১৩৩৬ সালে আশিকাগা শগুনাত প্রতিষ্ঠা করেন। এই শাসন প্রায় তিনশ বছর (১৩৩৬-১৫৭৩) স্থায়ী হয়। তবে, এই সময়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ডাইমিয়ো (অভিজাত শাসক) ও সামুরাই নেতারা বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এই অস্থিরতার ফলে ১৪৬৭-৭৭ সালে অনীন যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা আশিকাগা শগুনাতকে আরও দুর্বল করে। এই সময়ে সামুরাইদের তলোয়ার ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার ছিল। তারা কাতানা ও ওয়াকিজাশি নামক দুটি তলোয়ার বহন করত, যা তাদের সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ছিল। এই বিশেষাধিকার অন্যান্য শ্রেণির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

আশিকাগা যুগে জাপানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হয়। বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটে। তবে, গোষ্ঠীগত সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখে। সামুরাইরা এই সময়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়। শগুনাতের বংশধররা সর্বোচ্চ স্থানে থাকলেও, দক্ষ সামুরাই যোদ্ধারা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামাজিক অবস্থানে ছিল। এরপর ছিল কৃষক, জেলে, তাঁতি ও অন্যান্য পেশাজীবী সম্প্রদায়।
তুকোগাওয়া শগুনাত ও শান্তির যুগ
১৬শ শতকের শেষে সম্ভ্রান্ত ডাইমিয়ো তুকোগাওয়া ইয়াসু জাপানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। ১৬০৩ সালে তিনি তুকোগাওয়া শগুনাত প্রতিষ্ঠা করেন, যার রাজধানী ছিল এদো (বর্তমান টোকিও)। ১৬১৫ সালে গোষ্ঠীগত সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে এবং সামুরাইরা পুনরায় সেনাশাসনের অধীনে একত্রিত হয়। তুকোগাওয়া শাসনকালে সামুরাইদের অযাচিত ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং জনগণের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
তুকোগাওয়া শগুনাতের অধীনে জাপান প্রায় ২৫০ বছর (১৬০৩-১৮৬৮) শান্তির যুগ পার করে। এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম ও বুশিডো নীতির প্রসার ঘটে। বুশিডো, যা ‘যোদ্ধার পথ’ নামে পরিচিত, সামুরাইদের জন্য নৈতিকতা, আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও সম্মানের কোড হিসেবে কাজ করে। এই নীতি সামুরাইদের জীবনাচারকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জাপানের সমাজে সুশৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার ভিত্তি স্থাপন করে। তুকোগাওয়া যুগে জাপান একটি আবদ্ধ অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল।
মেইজে রেস্টোরেশন ও সামুরাইদের পতন
১৮৫৩ সালে আমেরিকান নৌ-কমোডর ম্যাথিউ সি পেরি জাপানে এসে বাণিজ্য চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এর ফলে তুকোগাওয়া শগুনাত ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই অবাধ পশ্চিমা বাণিজ্যের ফলে জাপানে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য দেখা দেয়। তুকোগাওয়ার এই সিদ্ধান্ত জনগণ ও সামুরাইদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, চৌশু ও সাতসুমার শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো সম্রাট মেইজির ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য ১৮৬৮ সালে ‘মেইজে রেস্টোরেশন’ ঘোষণা করে। ১৮৭১ সালে সামুরাই শাসনের বিলুপ্তি ঘটে এবং রাজপরিবার পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে।
মেইজে রেস্টোরেশনের পর সামুরাই শ্রেণি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়। অনেক সামুরাই রাজনৈতিক দলে যোগ দেন এবং আধুনিক জাপানের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সম্রাট মেইজির নেতৃত্বে জাপান ১৮৯৪-৯৫ সালে প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ এবং ১৯০৪-০৫ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জাপান মিত্রশক্তির পক্ষে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করে। তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান জার্মানির সঙ্গে মিলিত হয়ে যুদ্ধে পরাজিত হয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার আঘাতে দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সামুরাইদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার
যুদ্ধের পরাজয়ের পরও সামুরাইদের ঐতিহ্য জাপানের সংস্কৃতিতে অমলিন থাকে। বুশিডো নীতি আজও জাপানি সমাজের মার্জিত আচার-ব্যবহার ও নিয়মানুবর্তিতায় প্রভাব ফেলে। সামুরাইদের দেশপ্রেম, সংঘবদ্ধতা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও নৈতিকতা জাপানের জাতীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা ঔপনিবেশিক আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করেছে এবং জাতীয় বীর হিসেবে সম্মানিত।
বর্তমানে জাপানের রাজপরিবার নির্বাহী ক্ষমতা না থাকলেও জনগণের কাছে সম্মানের প্রতীক। সামুরাইদের বীরত্বগাঁথা ও তাদের বুশিডো নীতি জাপানের আধুনিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অদম্য যোদ্ধাদের ইতিহাস মহাকালের ডায়েরিতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সামুরাই যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধকৌশল
সামুরাইদের শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে তাদের কঠোর প্রশিক্ষণ ও অসাধারণ যুদ্ধকৌশল ছিল। অল্প বয়স থেকেই সামুরাই শিশুদের নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এই প্রশিক্ষণে শারীরিক দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক ও নৈতিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। তলোয়ারবাজি, তীরন্দাজি, ঘোড়ায় চড়া এবং হাতে-হাতে যুদ্ধের কৌশল ছিল তাদের প্রশিক্ষণের মূল বিষয়। বিশেষ করে কাতানা তলোয়ারের ব্যবহারে তারা অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। কাতানা শুধু একটি অস্ত্রই ছিল না, এটি ছিল তাদের সম্মান ও আত্মার প্রতীক।
সামুরাইরা যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তারা শত্রুদের দুর্বলতা খুঁজে বের করে আক্রমণের পরিকল্পনা করত। গেরিলা কৌশল, অতর্কিত আক্রমণ এবং রাত্রিকালীন যুদ্ধে তারা বিশেষ পারদর্শিতা দেখাত। মোঙ্গল আক্রমণের সময় সামুরাইরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হাকাতা উপসাগরে মোঙ্গল নৌবহরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এছাড়া, তারা বুশিডো নীতির অধীনে যুদ্ধে আত্মত্যাগের মনোভাব পোষণ করত, যা তাদের শত্রুদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করত।
সামুরাইদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা
সামুরাইরা শুধু যোদ্ধা ছিল না, তারা ছিল জাপানি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জীবনধারা ছিল শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সম্মানের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। বুশিডো কোড অনুসারে, একজন সামুরাইকে সততা, সাহস, দয়া, সম্মান, আনুগত্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কর্তব্যপরায়ণতার গুণাবলী পালন করতে হতো। তারা ধ্যান ও জেন বৌদ্ধ ধর্মের মাধ্যমে মানসিক শান্তি ও আত্মিক শক্তি অর্জন করত।
সামুরাইরা শিল্পকলার প্রতিও আগ্রহী ছিল। তারা ক্যালিগ্রাফি, কবিতা রচনা, চা-অনুষ্ঠান (চানোয়ু) এবং ফুলের সাজসজ্জা (ইকেবানা) এ দক্ষতা অর্জন করত। এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তাদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত। তুকোগাওয়া যুগে শান্তির সময়ে অনেক সামুরাই যুদ্ধের পরিবর্তে প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত কাজে নিয়োজিত হয়। তারা স্থানীয় ডাইমিয়োদের অধীনে কাজ করত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুশিডো নীতির শিক্ষা প্রদান করত।
সামুরাইদের পোশাকও ছিল তাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা কিমোনো ও হাকামার সাথে দুটি তলোয়ার বহন করত, যা তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রকাশ করত। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা বর্ম (ইয়োরোই) পরিধান করত, যা ছিল হালকা কিন্তু শক্তিশালী এবং যুদ্ধে তাদের নমনীয়তা প্রদান করত। সামুরাইদের এই সংস্কৃতি ও জীবনধারা জাপানি সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা আজও জাপানের ঐতিহ্যে প্রতিফলিত হয়।
সামুরাইরা জাপানের ইতিহাসে এক অমিট শক্তি ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তাদের অদম্য সাহস, বুশিডো নীতির প্রতি অটল আনুগত্য এবং দেশপ্রেম জাপানের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো গঠনে অপরিসীম অবদান রেখেছে। প্রাচীনকালে কৃষিজমি রক্ষা থেকে শুরু করে শগুনাত শাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা, সামুরাইরা শুধু যোদ্ধাই ছিল না, তারা ছিল নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি। মেইজে রেস্টোরেশনের মাধ্যমে তাদের শাসনের অবসান হলেও, তাদের ঐতিহ্য ও বুশিডো নীতি আধুনিক জাপানের নিয়মানুবর্তিতা ও সম্মানের সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে চলেছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শান্তির যুগে, সামুরাইদের বীরত্বগাঁথা এবং তাদের জীবনদর্শন জাপানি জাতির চেতনায় চিরন্তন হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।
